নদ-নদী, পুকুর, খাল-বিলবেষ্টিত রংপুর বিভাগের আটটি জেলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি রয়েছেন মাত্র পাঁচজন। বিশাল এ অঞ্চলের জন্য এ সংখ্যা শুধু অপ্রতুলই নয়, বরং উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, বিভাগের কোনো জেলা বা উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির নির্দিষ্ট কোনো পদ নেই। ফলে পানিতে ডুবে কেউ নিখোঁজ হলে রংপুর বিভাগীয় কার্যালয়ের এই পাঁচ ডুবুরির ওপরই নির্ভর করতে হয় পুরো বিভাগের মানুষকে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, চলতি বছরের বর্ষা মৌসুম শুরুর পর থেকে পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। গত এক মাসেই রংপুর বিভাগের আট জেলায় অর্ধশতাধিক মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। কিন্তু ডুবুরি সংকটের কারণে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই উদ্ধার অভিযান শুরু হওয়ার আগেই নিভে যাচ্ছে বেঁচে থাকার সম্ভাবনা।
রংপুর বিভাগের অন্তর্ভুক্ত রংপুর, গাইবান্ধা, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, দিনাজপুর, পঞ্চগড় ও ঠাকুরগাঁও—এই আটটি জেলা ভৌগোলিকভাবে নদীমাতৃক অঞ্চল। বর্ষা মৌসুমে নদীর পানি বৃদ্ধি, নৌকাডুবি, বন্যা ও বিভিন্ন জলাশয়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি এখানে বেশি। কিন্তু সেই ঝুঁকির তুলনায় উদ্ধার সক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত।
ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁওয়ের মতো দূরবর্তী জেলা থেকে জরুরি কল এলে রংপুর থেকে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে দুই থেকে আড়াই ঘণ্টা সময় লেগে যায়। ততক্ষণে নিখোঁজ ব্যক্তিকে জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা প্রায় শেষ হয়ে যায়। ঘটনাস্থলে পৌঁছে স্থানীয় মানুষের ক্ষোভের মুখেও পড়তে হয় উদ্ধারকর্মীদের।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ৬ জুন পর্যন্ত ২২টি উদ্ধার-সংক্রান্ত কল পেয়েছে বিভাগীয় ডুবুরি দল। এসব ঘটনায় পানিতে ডুবে যাওয়া ২৩ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে বাস্তবে পানিতে ডুবে মৃত্যুর সংখ্যা এর চেয়ে অনেক বেশি।
গত এক মাসে বিভাগের বিভিন্ন জেলায় একের পর এক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে। ৩ মে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাটে নীরব নামে তিন বছরের এক শিশু, ১২ মে লালমনিরহাটের পাটগ্রামে চার বছর বয়সী এক শিশু, ১৬ মে তিস্তা নদীতে ডুবে দুই ভাই, ২০ মে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে সাবিয়া জান্নাত (৬) ও সিয়াম (৪), ২৭ মে গঙ্গাচড়ায় রুশা মনি (১৫) ও তার ভাই সাইফ (৫), ২৮ মে ঠাকুরগাঁওয়ের রানীশংকৈলে মোমিন আলী, ২৯ মে রংপুরের তারাগঞ্জে অহিদ ইসলাম (১৫) ও মাসুদ রানা (১৬), ৩ জুন দিনাজপুরের খানসামায় আত্রাই নদীতে মান্না ইসলাম (৪৫) ও সাদ্দাম হোসেন (৩২), ৩১ মে কুড়িগ্রামের রাজিবপুরে চার বছরের এক শিশু, ১ জুন গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে সৃজন কুমার (৬) ও বৃন্দা রানী (৫) এবং ৬ জুন সাদুল্লাপুরে সিনথিয়া আক্তার (১১) পানিতে ডুবে মারা যায়।
এছাড়া ৩ জুন থেকে ৬ জুনের মধ্যে রংপুরের পীরগাছায় ছয় শিশু, ৫ জুন ঘাঘট নদীতে নেমে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী, ৭ জুন পঞ্চগড় সদর উপজেলায় দুই মাদরাসাছাত্র এবং একই দিনে নীলফামারীর ডিমলায় রুপাইয়া (৪) ও আশফিকা (৪) নামে দুই চাচাতো বোনের মৃত্যু হয়। সর্বশেষ ৭ জুন লালমনিরহাটে ধরলা নদীতে গোসল করতে নেমে নিখোঁজ দুই ভাইয়ের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ১৯৯০ সালে ২৫ সদস্যের একটি ডুবুরি ইউনিট গঠনের মাধ্যমে উদ্ধার কার্যক্রম শুরু হয়। পরে তাদের দেশের বিভিন্ন ফায়ার সার্ভিস স্টেশনে পদায়ন করা হয়। সে সময় রংপুরে দুইজন ডুবুরি দায়িত্ব পান। প্রায় তিন দশক দুই ডুবুরি দিয়ে কাজ চালানোর পর ২০১৯ সালে আরও তিনজন যোগ দিলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় পাঁচে। এরপর আর কোনো জনবল বাড়েনি। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের অবকাঠামোগত সক্ষমতা বাড়লেও ডুবুরি সংকট কাটেনি।
ফায়ার সার্ভিসের বিভাগীয় কার্যালয় সূত্র জানায়, পানি বহনকারী গাড়ি, ফোম টেন্ডার, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম যুক্ত হয়েছে। কিন্তু জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ডুবুরির কোনো পদ সৃষ্টি না হওয়ায় সংকট আগের মতোই রয়ে গেছে।
বর্তমানে রংপুর বিভাগীয় ফায়ার সার্ভিসে কর্মরত ডুবুরি আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘পঞ্চগড় থেকে কল এলে রংপুর থেকে যেতে অন্তত দুই-আড়াই ঘণ্টা লাগে। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর স্থানীয়রা প্রশ্ন করেন, এত দেরি হলো কেন। কিন্তু দূরত্বের বাস্তবতা তো অস্বীকার করা যায় না।’
তিনি জানান, অনেক সময় পঞ্চগড়ে কয়েক ঘণ্টা কাজ শেষ করে গাইবান্ধায় যেতে হয়। আবার সেখান থেকে লালমনিরহাট বা অন্য জেলায় ছুটতে হয়। কখনও টানা পাঁচ থেকে সাত দিন এক জেলা থেকে আরেক জেলায় উদ্ধার কাজে ব্যস্ত থাকতে হয়। ডুবুরির সংখ্যা বাড়লে এ ভোগান্তি অনেকটাই কমবে।
রংপুর নগরীর কটকিপাড়ার বাসিন্দা ও সাবেক রোভার স্কাউট সদস্য সাব্বির আহমেদ বলেন, ফায়ার সার্ভিস বর্তমানে দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জরুরি সেবা প্রতিষ্ঠান। কিন্তু পঞ্চগড়ে কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রংপুর থেকে ডুবুরি পৌঁছাতে দুই ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। এ সময়ে একজন মানুষের পানির নিচে বেঁচে থাকার সুযোগ থাকে না। ফলে ডুবুরিরা গিয়ে কেবল মরদেহ উদ্ধারের কাজই করতে পারেন। এ অবস্থায় ডুবুরির মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে জনবল সংকট অযৌক্তিক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডুবুরি সংকটের পাশাপাশি সচেতনতার অভাবও পানিতে ডুবে মৃত্যুর অন্যতম কারণ। শিশুদের একা না রাখা, জলাশয়ের আশপাশে নজরদারি বাড়ানো এবং সাঁতার শেখানোর মাধ্যমে অনেক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
পীরগাছা উপজেলার কান্দি ইউনিয়নের শিক্ষক আমিনুল ইসলাম বলেন, সাঁতার না জেনে পানিতে নামা উচিত নয়। একই সঙ্গে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। শিশুদের কোনো অবস্থাতেই একা ছেড়ে দেওয়া ঠিক নয়।
বাংলাদেশ স্কাউটসের লিডার ট্রেইনার সিদ্দিকুর রহমান বলেন, দুর্ঘটনার পর স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছালেও ডুবুরি না থাকায় পানির নিচে উদ্ধার অভিযান শুরু করা সম্ভব হয় না। রংপুর বা অন্য জেলা থেকে ডুবুরি আসতে যে সময় লাগে, সেটিই অনেক ক্ষেত্রে প্রাণহানির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তার মতে, রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলায় অন্তত একটি পূর্ণাঙ্গ ডুবুরি ইউনিট থাকা প্রয়োজন, যেখানে পাঁচ থেকে ছয়জন প্রশিক্ষিত ডুবুরি থাকবেন। পাশাপাশি সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক সাঁতার প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা জরুরি। অন্যথায় ডুবুরি সংকটের এই মূল্য রংপুরবাসীকে আরও দীর্ঘ সময় ধরে দিতে হবে।
রংপুর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ডুবুরিদের কোনো জেলা পর্যায়ের পদ নেই। তারা বিভাগীয় কার্যালয়ে কর্মরত থাকেন এবং সেখান থেকেই বিভিন্ন জেলায় দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমান জনবল দিয়ে এত বড় অঞ্চলের চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং নতুন ডুবুরি নিয়োগের প্রক্রিয়া চলছে বলে তারা জেনেছেন।
রংপুর ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. আনোয়ারুল হক বলেন, ‘বারবার ডুবুরি চেয়ে অধিদপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। এখনও সংকট কাটেনি। তবে আশা করছি, খুব দ্রুতই নতুন ডুবুরি পাওয়া যাবে।’